এড়িয়ে লেখায় যান

“ব্রেনওয়াশড”

আমি যখন এই ব্লগটি লিখছি তখন শাহবাগ আন্দোলনের পনেরতম দিন অতিবাহিত হচ্ছে। কিসের আন্দোলন এ প্রশ্নের উত্তর কারও কাছে আর অজানা নয়। এটি কোনো রাজনৈতিক দলের; সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন নয়,নয় কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর   আন্দোলন। এ এমনই এক আন্দোলন যে আন্দোলনের দাবী সকল বাঙ্গালীর প্রাণের দাবী। রাজাকারের যুদ্ধাপরাধী রাজাকারদের বিচারের দাবী। আর সে বিচার একটাই তা হল “ফাঁসি”। স্বাধীনতার   ৪২ বছর পরও আমরা তাদের বিচার করতে পারি নি যারা কিনা এ দেশকে চায় নি,এ দেশের পতাকাকে চায় নি। কিন্তু একটি লজ্জিত জাতি হিসাবে সেসকল পশুদের বহনকারী গাড়িতে উড়েছে স্বাধীন দেশের পতাকা! দাম্ভিকতার সাথে চলেছে লাখ শহীদের রক্তে ভেজা এ বাংলার মাটিতে। তাহলেতো তাদের ফাঁসির দাবিতে সকলের এ আন্দোলনকে সমর্থন করার কথা ছিল। কিন্তু তারপরেও তা হয় নি। পাকি বীর্যে গড়া জামাত-শিবির নানান উপায়ে নানানভাবে এ আন্দোলনকে প্রতিহত করার চেষ্টা করছে। এ সম্পর্কে আর কারও জানার বাকি নেই। কিন্তু কথা হল এমন একটি জাতীয় আন্দোলনে কেন আমরা দেশের সবাইকে পাচ্ছি না। কেন কিছু তরুণ,যুবক না একটি দল এ বিরুদ্ধে? কারণ কিছুই না। তারা ব্রেনওয়াশড।

বাংলাদেশে যে কয়েকটি ইসলামী! রাজনৈতিক দল রয়েছে তার মাঝে “বাংলাদেশ জামায়েতে ইসলামী” এবং “বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির” অন্যতম। তাদের হোতা কিন্তু নিজামী,সাঈদী,গোলাম আজমের মত রাজাকাররা। কিন্তু এই দুটি দলের সদস্যদের কাছে তারা পরম পূজনীয়। কেন? কেননা তারা একটি ইসলাম ধর্মের একটি ক্যামোফ্লেজ ধারণ করে থাকে। যা    এই কার্টুন                                                       285756_253204874815694_937071838_n থেকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান। আর এ কথা সবাই জানে বেশিরভাগ মানুষের কাছেই ধর্ম একটি বেশ স্পর্শকাতর ব্যাপার। সাধারণ মানুষ ভাবতেই পারে না যে ধর্মের নাম দিয়ে কেউ কোনো অপরাধ করতে পারে। তবে জামাত-শিবিরের প্রতি কিছু মানুষের অন্ধ বিশ্বাস থাকার আরও কিছু কারণ আছে।

এ কথা মানতেই হবে যেকোনো ছাত্র সংগঠন থেকে শিবির বেশ সংগঠিত। মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের উপর কেন্দ্রের আছে পরিপূর্ন নিয়ন্ত্রন যা কিনা ছাত্রলীগের বা  অন্যান্য ছাত্র সংগঠনগুলোর মাঝে তেমনভাবে লক্ষ্যনীয় নয়। এই ছাত্রলীগের কথা ভাবুন না। একটা ঘরের দুইটা রুমে যদি ছাত্রলীগের সদস্যদেরকে রাখা হয় তবে একটি নির্দিষ্ট সময় পর সেই ঘর দখল নিয়ে দুই রুমের ছাত্রলীগ কর্মীদের মাঝে মারামারি বাঁধতে বাধ্য। আর একাডেমিকভাবেও শিবিরের কর্মীরা বেশ এগিয়ে। কেননা তারা ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভাল ছাত্রদেরকে হাত করে নেয় আগে থেকেই। প্রক্রিয়াটির শুরু হয় এভাবে।

জামাত-শিবিরের রয়েছে “অঙ্কুর”এর মত প্রতিষ্ঠান যারা কিনা প্রতি বছর বৃত্তির আয়োজন করে,ফুলকুঁড়ির মত সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান যারা প্রতি বছর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে নাটক এমনকি প্রতি মাসে কুইজ প্রতিযোগিতা,মৌসুমী ফলের আসর ইত্যাদি আয়োজন করে থাকে। এখানে রাজনীতির লেশমাত্র না থাকায় বরং বেশ শিক্ষামূলক হওয়ায় কোমলমতী ছাত্র-ছাত্রীদের সেখানে থাকে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। এমনকি অভিভাবকেরাও এতে সায় দেন। ফলে শিক্ষার্থী এবং অভিভাবক উভয়ের কাছেই এসকল প্রতিষ্ঠান একটি গ্রহনযোগ্যতা অর্জন করে। এরপর আসে পরের ধাপ। প্রতি এলাকায় নিয়জিত শিবির কর্মীর উপর দায়িত্ব দেওয়া হয় ঐ এলাকার বিভিন্ন স্কুলের বিভিন্ন ক্লাশের ভাল ভাল ছাত্রদের উপর নজর রাখতে। তাদের কাজ হল ঐ ভাল ছাত্রদেরকে নামাজ পড়তে উৎসাহিত করা,তারা নিয়মিত কোরান পাঠ করে কিনা,পড়াশুনা করে কিনা ইত্যাদি খবর রাখা। আর এজন্য তারা ছাত্র শিবিরের পক্ষ থেকে “ব্যক্তিগত রিপোর্ট বই” নামে একটি ডায়েরী দিয়ে থাকে যেখানে ছাত্ররা প্রতিদিন কয় ওয়াক্ত নামাজ পড়েছে,কয় পাতা কোরান পড়েছে,কয় ঘন্টা পড়াশুনা করেছে তা লিপিবদ্ধ করে। শিবিরের পক্ষ থেকে মাস শেষে আবার সেরা ছাত্রকে পুরস্কৃত করা হয়। এখানেও আছে খেল। পুরষ্কার হিসাবে যা দেওয়া হয় তাহল “কিশোরকন্ঠ”, “এসো আলোর পথে”, “মুক্তির পয়গাম” এর মত জামাত-শিবির কর্তৃক প্রকাশিত পত্রিকা। যেখানে মুসলমানদের পূর্বের গর্বের ইতিহাসের পাশাপাশি বর্তমান অবস্থা এবং তার কারন নিয়ে ব্যাখ্যা থাকে। নাহ! এখন পর্যন্ততো কিছু খারাপ দেখা গেল না। তবে আস্তে আস্তে শুরু হয় তাদের কাজ। তারা প্রথমেই “ইসলামী ছাত্রশিবির”এর সমর্থক ফর্ম পূরণ করতে বলে শিক্ষার্থীদেরকে। মজার কথা হল এ ফর্ম পূরণ করতে দেওয়া হয় অন্য ধর্মের শিক্ষার্থীদেরকেও। এত দিন ধরে ভাল জেনে আসা সংগঠনটির জন্য এইটুকু করতে সাংস্কৃতিক এতটুকুও চিন্তা করতে হয় না কোমলমতী শিক্ষার্থীদের।

স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে তারা ভর্তি হয় কলেজে। শিবিরের শকুন চোখ কিন্তু তাদের ছাড়ে না। তারা খুব সতর্ক উপায়ে বাছাই করতে থাকে কে হবে তাদের প্রতিনিধি। কে কয়টা সুরা অর্থসহ বলতে পারে এ ধরণের  প্রতিযোগিতাও করা হয়। মাঝে মাঝে এলাকায় আসে কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতা। স্থানীয় নেতারা কেন্দ্রীয় নেতার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয় তাদের বেস্ট রিক্রুটদের। কেন্দ্রীয় নেতারা এক কথা দুই কথা দিয়ে দেশের পরিস্থিতি,ইসলামের বিভিন্ন পরিস্থিতি তুলে ধরে তাদের সামনে এবং বুঝানোর চেষ্টা করে যে এই সংগঠনটি ইসলামকে আজ বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। এখানেও কিন্তু রাজনৈতিক ইঙ্গিত বেশ অস্পষ্ট। তা বুঝে না কেউ। ইসলামকে রক্ষার জন্য নাস্তিক-বিধর্মীদের হাত থেকে রক্তে আগুন জ্বলে উঠে তাদের। তাদের অন্যান্য বন্ধুদেরকে এ দাওয়াত পৌছে দিতে যা কিনা ছাত্র শিবিরের পাঁচ দফা কর্মসূচির মাঝে প্রথম। তারপর ছাত্রদের মাথা ঢুকিয়ে দেওয়া হয় যে একা একা করলে কিছুই করা সম্ভব না। তাই সবাইকে একটি সংগঠনের আওতায় আসতে হবে যা কিনা তাদের দ্বিতীয় কর্মসূচি। আর এ সংগঠন হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় ছাত্রশিবিরকে। আর সংগঠন করতে হলে কিন্তু পালন করতে হবে দায়িত্ব। তাই “বায়তুল মাল”এর নাম করে সবার কাছ থেকে নেওয়া হয় একটি নির্দিষ্ট পরিমাণের টাকা। আর তাদের সেরা সেরা রিক্রুটদেরকে দেওয়া হয় নানান প্রাতিষ্ঠানিক পদ। সভাপতি,সম্পাদক ইত্যাদি নানান লোভনীয় পদের নাম মুহূর্তেই আকর্ষণ করে শিক্ষার্থীদেরকে। এটাই তাদের প্রথম রাজনৈতিক চাল। এভাবে তারা সমর্থক থেকে উন্নতদেরকে দেউ “সাথী” নামক একটি পদ। আর পদ পাওয়ার পরেই আর কথা নেই। প্রতিদিন নামাজের পর বসতে বলা হয় তাদেরকে। আলোচনা করা হয় নানান দিক নিয়ে। কথা হয় বাকি ত্নটি কর্মসূচি প্রশিক্ষন,ইসলামী শিক্ষা আন্দোলন এবং ইসলামী সমাজ বিনির্মাণ নিয়ে। বিষবাষ্প ঢুকিয়ে দেওয়া হয় তাদের কানে। চলে ব্রেনওয়াশ। এখানে আমি ব্রেনওয়াশ এ করণেই বলছি যে খুব কম শিক্ষার্থীই বুঝতে পারে যে তারা কোন পথে চলেছে। যার ফলশ্রুতিতেই তারা সাইদি কে রাজাকার মানতে নারাজ। কারণ তাদের মতে এমন একজন ইসলামিক আলেম কখনও এ ধরণের কাজ করতে পারেননা। আর শাহবাগের আন্দোলনকে তারা নেয় নাস্তিকদের ইসলাম ধ্বংসের আন্দোলন হিসেবে। আর তাই এ বিরোধিতা করা তাদের কাছে জিহাদ তুল্য বলে মনেহয়। “বাঁচলে গাজী আর মরলে শহীদ” এটাই তাদের কাছে জীবনের মূল মন্ত্র বলে মনেহয়। হরতালের দিন পুলিশ আর সাধারণ মানুষ তাদের চোখে হয়ী যায় শয়তান তুল্য যাদের এখনই খতম করা দরকার। সেদিন “আজাদি” পত্রিকায় পড়লাম সাইদির রায় যদি ফাঁসি হয় তাহলে এর বিরদ্ধে আন্দোলন করার জন্য নাকি গঠন করা হচ্ছে “সুইসাইড স্কোয়াড”।

যারা নাকি ইতোমধ্যেই তাদের মা-বাবার কাছ থেকে দোয়া নিয়ে এসেছে শহীদ হওয়ার জন্য। তারা বেশিভাগই দরিদ্র পরিবারের ছেলে। বিভিন্ন ফোরকানিয়া মাদ্রাসা বা গোপন জায়গায় চলে যাদের প্রশিক্ষন। রাতভর আবার চলে যিকির-আজকারও।রাত শেষে মুনাজাত করে নাকি প্রার্থনা করা হয় শহীদ হওয়ার জন্য। কি অদ্ভুত তাদের মানুষিকতা। কিভাবে বিকিয়ে ফেলেছে নিজের বিবেককে। আর তার শুরু কিন্তু সেই ছোটবেলা থেকেই। আমার এলাকারও অনেক ছোট ছোট ভাই আছে যারা এই ব্রেনওয়াশের শিকার। শাহবাগ থেকে শুরু করে সারা দেশের আন্দোলনকারীরা আজ তাদের চোখে নাস্তিক,ইসলামের শত্রু। আর সাঈদী,নিজামি,গোলাম আজমের মত ব্যক্তিরা ইসলামের ধারক ও বাহক। তাই থাবা বাবার মৃত্যুতে তারা উৎফুল্ল। কবে বন্ধ করতে পারব আমরা আমাদের এই মেধাবী,কোমলমতী শিখার্থীদেরকে এই ব্রেনওয়াশের হাত থেকে রক্ষা করতে? যদি নাই পারি তাহলে কি আমরা নিজেরা অপরাধী হয়ে থাকব না একটি দেশের মেধাবী সন্তানদের হারিয়ে যেতে দিয়ে? রুখে দাঁড়াতে হবে আমাদেরকেই। সবাই নিজ নিজ এলাকার ছোট ভাইদের প্রতি খেয়াল রাখুন যাতে করে তারা এর শিকার না হতে পারে। তাদেরকে শাহবাগের আন্দোলন সম্পর্কে অবহিত করুন কেন কিসের দাবিতে আমরা আজ একত্রিত? রাজাকাররা কারা? কি করেছিল তারা মুক্তিযুদ্ধের সময়? জানিয়ে দিন তার প্রকৃত ইতিহাস। আর জামাত-শিবিরই বা কারা? কি তাদের উদ্দেশ্য। অন্তত এ ব্যাপারে জানিয়ে দিন তারা কখনও ইসলামের ধারক হতে পারে না। যারা গাড়ি ভাঙ্গা,পোড়ানোর মত খারাপ কাজ করার সময় আল্লাহর নাম নিতে পারে, স্বাধীনতা সময়ে গণহত্যা চালাতে পারে তারা কখনও ইসলামকে ও বাংলাদেশে ভালবাসতে পারে না। তাদের বুঝিয়ে দিন ধর্মীয় নিরপেক্ষতা মানে ইসলাম ধ্বংস করা নয়। চিনিয়ে দিন বাংলাদেশ ও ইসলামের প্রকৃত শত্রু জামাত শিবিরকে যারা ধর্মকে ব্যবহার করে প্রতিনিয়ত নানান ঘৃণ্য কাজ করে যাচ্ছে তাই যদি কেউ বাংলাদেশ এবং ইসলামকে ভালবেসে থাকে তাহলে কখনই তারা জামাত-শিবিরকে সমর্থন করতে পারে না। অন্তত আমাদের নতুন প্রজন্মকে এ করাল গ্রাস থেকে বাঁচাবার দায়িত্ব আমাদেরকেই তুলে নিতে হবে।

 

“চতুর্পান্ডব”

সংস্কৃত ভাষায় রচিত প্রাচীন ভারতের দুটি প্রধান মহাকাব্যের অন্যতম  হল “মহাভারত”(অপরটি হল রামায়ণ)। এ মহাকাব্যটি হিন্দুশাস্ত্রের  “ইতিহাস” অংশের অন্তর্গত । “মহাভারত”র এর মূল উপজীব্য  বিষয় হল কৌরব ও পাণ্ডবদের গৃহবিবাদ এবং কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পূর্বাপর ঘটনাবলি। কুরু রাজবংশের যোগ্য রাজা খুঁজে পাওয়ার জন্য কৌরব এবং পাণ্ডবদের এই যুদ্ধে পাণ্ডব শিবিরে ছিলেন পাণ্ডুর পাঁচ পুত্র  যুথিষ্ঠির, ভীম, নকুল, সহদেব এবং অর্জুন যারা ইতিহাসে “পঞ্চপাণ্ডব” নামে খ্যাত। তেমনিভাবে বাংলা সাহিত্যকে অলংকৃত করার জন্যও প্রয়োজন হয়েছিল বুদ্ধদেব বসু,বিষ্ণু দে,অমিয় চক্রবর্তী,সুধীন্দ্রনাথ দত্ত,জীবনানন্দ দাশ এই পঞ্চপাণ্ডবদের। কিন্তু প্রকৃতির মৌলিক বলগুলোকে ব্যাখ্যা করার জন্য প্রয়োজন হয় না পঞ্চপাণ্ডবদের। এর জন্য আমাদের “চতুর্পান্ডব”রাই যথেষ্ট। আর মৌলিক বলের শিবিরে আমাদের এই চতুর্পান্ডবরা হল মহাকর্ষ বল,তড়িত-চুম্বকীয় বল,দূর্বল নিউক্লীয় বল এবং সবল নিউক্লীয় বল।  নাটকীয় সূচনার পরিধি আর না বাড়িয়ে চলুন চলে যাই আমাদের এই “চতুর্পান্ডব”দের চরিত্রায়নে। তাদের শক্তিই বা কতো? পান্ডবরা যেমন  খুঁজে পেয়েছিল কুরু বংশের যোগ্য রাজা যুথিষ্ঠিরকে ঐ পঞ্চপাণ্ডব শিবির থেকে, আমাদের চতুর্পান্ডবরা কি পারবে সঠিকভাবে প্রকৃতিকে ব্যাখ্যা করতে? দেখা যাক কি হয়…..

 

মহাকর্ষ বলঃ

 

মহাবিশ্বের যেকোনো দুটি বস্তুর মধ্যকার আকর্ষণ বলকে মহাকর্ষ বল বলে।  নিউটনের মহাকর্ষ সূত্রানুসারে এই বলের মান বস্তুদ্বয়ের ভরের গুণফলের সমানুপাতিক এবং দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতিক। আপনার হাতের মোবাইল সেটটি কিংবা আপনি যে বইয়ের পাতা অথবা কম্পিউটারের স্ক্রিনে বসে এ লেখাটি পড়ছেন তার সাথে কিন্তু আপনার একটি আকর্ষণ বল কাজ করছে যা হচ্ছে মহাকর্ষ বল। কিন্তু এ বল এতো নগন্য যে আমরা তা অনুভব করতে পারিনা। মহাকর্ষ বলের দরুণই আমরা ওজন অনুভব করে থাকি। আমরা একটি ছোটো চুম্বক দ্বারা খুব সহজেই একটি পিনকে টেনে তুলতে পারি যখন পুরো পৃথিবী পিনটিকে মহাকর্ষ বল দ্বারা ধরে রেখেছে! বলাবাহুল্য, প্রকৃতির চারটি মৌলিক বলের মাঝে এই মহাকর্ষ বলই সবচেয়ে দূর্বলতম। উদাহরণসরূপ, কোনো হাইড্রোজেন পরমাণুতে একটি প্রোটন এবং একটি ইলেকট্রনের মধ্যকার আকর্ষণ বল মাত্র 3.6 x  নিউটন যেখানে কণা দুটির মাঝে স্থির তড়িৎ বল প্রায় 8.2 x  নিউটন। তবে এ বলই বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে যদি বস্তু দুটির ভর অনেক বেশি হয়। উদাহরণসরূপঃ সূর্য ও পৃথিবী। তারমানে মহাকর্ষ এমন দুটি বস্তুর মাঝে ক্রিয়া করবে যাদের ভর আছে। এটি দূর্বল হলেও আমাদের কাছে এতো গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কারণ এই বলের পাল্লা অসীম এবং এই বল  সবসময়ই আকর্ষণধর্মী। কিন্তু প্রকৃতির অন্য তিনটি বল কখনো আকর্ষণধর্মী এবং কখনও বিকর্ষণধর্মী হয়ে থাকে। এর ফলে এদের একে অপরকে নাকচ করে দেওয়ার একটি সম্ভাবনা থেকে থাকে যেটি মহাকর্ষ বলে ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। এখন কথা হচ্ছে মহাকর্ষ বল কিভাবে দুটি বস্তুর মাঝে ক্রিয়াশীল হয় আর এর পাল্লা কেনই বা বেশি?

কোয়ান্টাম বলবিদ্যার দৃষ্টিতে দুটি পদার্থ কণার অন্তর্বর্তী বল বহন করে গ্রাভিটন নামক একটি ভরহীন,আধানহীন কণা যার স্পিন ২ (যেসকল কণাকে এক অর্ধবৃত্ত মানে ১৮০ ডিগ্রী ঘুরানো হলে দেখতে আগের মত লাগে। যেমনঃ তাসের কিং বা কুইনের কার্ডটি)। আর যেহেতু এই কণার কোনো ভর নেই তাই এ কণা যে বল (মহাকর্ষ বল) বহন  করবে তার  পাল্লা হবে অনেক দীর্ঘ অর্থাৎ সে বেশি দূরত্ব পর্যন্ত বল বিনিময় করতে পারবে। বলা হয়ে থাকে যে সূর্য এবং পৃথিবীর অন্তর্বর্তী মহাকর্ষীয় বল এই গ্রাভিটন নামক পারষ্পরিক বিনিময় থেকেই সৃষ্ট।  এক্ষেত্রে গ্রাভিটনকে মেসেঞ্জার পার্টিকেলও বলা হয়ে থাকে যদিও এটি একটি কল্পিত কণিকা। ক্ল্যাসিক্যাল পদার্থবিজ্ঞানীরা যাকে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ বলতেন তাই আসলে গ্রাভিটন। তবে মহাকর্ষীয় তরঙ্গগুলি খুব দূর্বল হওয়ায় কখনোই তাদেরকে সনাক্ত বা পর্যবেক্ষণ করা যায় নি। এই মহাকর্ষ বল দ্বারা কোনো বস্তুর ভূমিতে পতন থেকে শুরু করে উচ্চ পাল্লার ক্ষেত্রে কৃষ্ণগহ্বর এমনকি  গ্যালাক্সির গঠন পর্যন্ত ব্যাখ্যা করা যায়। মহাকর্ষ বলকেই প্রথম  গাণিতিকভাবে ব্যাখ্যা করা গিয়েছে। এরিস্টটল থেকে শুরু করে গ্যালিলিও,নিউটন মহাকর্ষ বলকে ব্যাখ্যা  করে গেলেও এ সঙ্ক্রান্ত আমাদের বর্তমান ধারণার ভিত হচ্ছে আইন্সটাইনের আপেক্ষিকতার নীতি।

তড়িৎ চুম্বকীয় বলঃ

 

তড়িত-চুম্বকীয় বল দুটি বৈদ্যুতিক আধানে আহিত বস্তুর মাঝে ক্রিয়া করে। দুটি আহিত কণা যখন স্থির অবস্থায় থাকে তখন তাদের মাঝে যে বল ক্রিয়া করে তাকে তাড়িত বল বলা হয় যাকে আমরা কুলম্বের স্থির বৈদ্যুতিক আধান সঙ্ক্রান্ত সূত্র থেকে ব্যাখ্যা করতে পারি। কিন্তু যখন এই দুটি চার্জবাহী কণা গতিশীল হয় তখন একটি চুম্বকক্ষেত্র সৃষ্টি হওয়ার দরুণ নতুন একটি বলে উদ্ভব ঘটে যা চৌম্বক বল নামে খ্যাত। আর এই তাড়িত আর চৌম্বক বলের মিলিত প্রভাবেই সৃষ্টি হয় তড়িত-চুম্বকীয় বল।

এই বলে ধনাত্বক আধান বিশিষ্ট প্রোটন এবং ঋনাত্বক আধান বিশিষ্ট কণার সাথে পারষ্পরিক ক্রিয়া হলেও গ্রাভিটনের মত আধানহীন কণার সাথে কোনো ক্রিয়া হয় না। সমধর্মী আধান পরষ্পরকে বিকর্ষণ এবং বিপরীতধর্মী আধান পরষ্পরকে আকর্ষণ করবে। আগেই বলে নেওয়া হয়েছে যে মহাকর্ষ বল বাদে বাকি তিনটি বল আকর্ষণ না বিকর্ষণ উভয় ধর্মই দেখাতে পারে। সূর্য বা পৃথিবীর ন্যায় একটি বিশাল বস্তুতে প্রায় সমান সংখ্যক ইলেকট্রন ও প্রোটন বিদ্যমান থাকায় একে অপরকে নাকচ করে দেয়। ফলে খুব সামান্য পরিমাণই তড়িত-চুম্বকীয় বল অবশিষ্ট থাকে। কিন্তু সূর্য  বা পৃথিবীর ন্যায় বিশাল বস্তুর জন্য সামান্য হলেও পরমাণুর ন্যায় ক্ষুদ্র মাত্রার ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আর মহাকর্ষ বলের তুলনায়তো এর মান বিশাল। খান একডেমীর ভিডিও এবং উইকিপিডিয়াতে তড়িৎচুম্বকীয় বল= x মহাকর্ষ বল বলা হলেও স্টিফেন হকিং এর “A Brief History of Time” বইয়ে একে x মহাকর্ষ বল এবং আমাদের আমাদের উচ্চ মাধ্যমিকের ডঃ শাহজাহান তপনের পদার্থ বিজ্ঞান ১ম পত্র বইয়ে এর মান  x মহাকর্ষ বল বলা হয়েছে। তবে মান যাই হোক না কেন এটি বুঝতে আমাদের কারও বাকি নেই যে মহাকর্ষ বলের তুলনায় এটি কত শক্তিশালী। চারটি বলের সাথে শক্তির দৌড়ে এর অবস্থান দ্বিতীয়। ছোট একটি উদাহরণ থেকে এই পার্থক্যটা আরও স্পষ্ট হওয়া যাক,

৪ কেজি(প্রায় ১ গ্যালন) পানি ধারণ করতে পারে এমন একটি জগে মোট ইলেকট্রন চার্জের পরিমাণ হিসাব করি। ধরে নেওয়া যাক জগটিতে কেবল ইলেকট্রন বিদ্যমান। এখন, ১ মোল পানির অণুতে ২ টি হাইড্রোজেন পরমাণু এবং একটি অক্সিজেন পরমাণু রয়েছে। সুতরাং, ১ মোল পানিতে মোট ইলেকট্রন সংখ্যা ১০টি (দু’টি হাইড্রোজেনের মোট দু’টি ইলেকট্রন এবং একটি অক্সিজেনের ৮ টি )। এখন তাহলে  ১ মোল পানিতে মোট চার্জের পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ১০x৯৬৫০০ কুলম্ব (যেহেতু ১ মোল ইলেকট্রন=৯৬৫০০ কুলম্ব)।  এখন চার কেজি মানে চার হাজার গ্রাম  পানিকে মোলে প্রকাশ করলে দাঁড়ায়,

4000/18 = 222.22 মোল পানি

সুতরাং চার কেজি পানিতে মোট ইলেকট্রন চার্জের পরিমাণ,

222.22 x 10 x 96500 = 2.14 x  কুলম্ব

 

এখন আমরা যদি এ ধরণের দুটি জগকে পরষ্পর হতে ১ মিটার দূরে রাখি (এক্ষত্রে জগ দু’টিতে ইলেকট্রন এবং প্রোটন উভয়ই বিদ্যমান)। তাহলে এরা একে অপরকে যে বলে বিকর্ষণ (যেহেতু দুটি জগ দু’টিতে সমধর্মী আধান) করবে তার মান,Capture

যা কিনা যদি একটি পৃথিবীর উপর আরেকটি পৃথিবী চাপিয়ে দেওয়া হয় তাহলে যে বল অনুভব করবে তার চেয়েও বেশি!!! এবার ধরি জগ দু’টিতে ইলেকট্রন এবং প্রোটন উভয়ই বিদ্যমান। এখন দুটি জগে থাকা প্রোটনগুলোও পরষ্পরকে বিকর্ষণ করবে একই বলে। কিন্তু এই বল নাকচ হয়ে যাবে ১ম জগে থাকা ইলেকট্রন-প্রোটনের ২য় জগে থাকা ইলেকট্রন –প্রোটনের মধ্যকার আকর্ষণ বলের কারণে। ফলে নীট আধানের পরিমাণ শূণ্য। অর্থাৎ যদি না ইলেকট্রন-প্রোটনের পারষ্পরিক মিথস্ক্রিয়ার ফলে নাকচ হয়ে যায় যায় তাহলে এই বলের মান অনেক প্রভাববিস্তারকারী হতে পারে।

তড়িত-চুম্বকীয় বলের ক্ষেত্রে মেসেঞ্জার পার্টিকেল হিসাবে দায়িত্ব পালন করে ফোটন নামক ভরহীন,স্পিন ১(যাদেরকে ৩৬০ ডিগ্রী ঘুরালে দেখতে আগের মত লাগবে।যেমনঃ তাসের একটি টেক্কা) বিশিষ্ট কল্পিত এক কণা।  আর ভরহীন কণার দ্বারা এ বল বাহিত হওয়ার কারণে এর পাল্লাও অসীম পর্যন্ত।

 

দূর্বল নিউক্লীয় বলঃ

 

আমারা জানি প্রকৃতিতে কিছু মৌলিক কণিকা আছে (পারমাণবিক ভর ৮২ এর চেয়ে বেশি) যাদের নিউক্লিয়াস স্বতস্ফূর্তভাবে ভেঙ্গে যায়। যা তেজস্ক্রিয়তা নামে পরিচিত এবং এসকল নিউক্লিয়াসদেরকে বলা হয় তেজস্ক্রিয় নিউক্লিয়াস। ভাঙ্গনের সময় এসকল নিউক্লিয়াস কিছু রশ্মি বিকিরণ করে যারা তেজস্ক্রিয় রশ্মি নামে পরিচিত। ১৮৯৯ সালে রাদারফোর্ড এবং ভিলার্ড বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার সাহায্যে বলেন যে,এরা হল ধনাত্বক চার্জ বিশিষ্ট আলফা,ঋনাত্বক চার্জ বিশিষ্ট বিটা এবং চার্জহীন গামা। তেজস্ক্রিয় নিউক্লিয়াস থেকে যখন বিটা কণা নির্গত হয় তখন কিছু পরিমাণ শক্তিও নির্গত হয় যা কিনা বিটা কণার কণার গতিশক্তি অপেক্ষা সামান্য বেশি। এখন প্রশ্ন আসে যদি বিটা কণা এ শক্তির সামান্য অংশ  বহন করে থাকে তবে বাকি শক্তির উৎস কি? ১৯৩০ সালে ডব্লিউ পাউলি প্রস্তাব করেন যে অবশষ্ট শক্তি বহন করে আরেকধরণের  কণিকা যা কিনা বিটা কণার সাথেই নির্গত হয়। এই কণাকে বলা হয় নিউট্রিনো। এই বিটা কণা এবং নিউট্রিনো কণা ফলেই সৃষ্টি হয় দূর্বল নিউক্লীয় বলের। একটা উদাহরণ দেখা যাক,

একটি সিজিয়াম পমাণুতে মোট নিউক্লীয়ন সংখ্যা ১৩৭। ।অর্থাৎ এতে প্রোটন ও নিয়ট্রনের মোট সংখ্যা ১৩৭। একটি সিজিয়াম পরমাণুতে মোট প্রোটনের সংখ্যা হল ৫৫টি। এখন যদি “কোনোভাবে” একটি নিউট্রন একটি প্রোটনে পরিণত হতে পারে তবে মোট নিউক্লীয়ন সংখ্যার কোনো পরিবর্তন না হলেও যেহেতু একটি প্রোটন বেড়ে গিয়ে ৫৬ হয়ে যাচ্ছে ফলে পরমাণুটি আর সিজিয়াম পরমাণু থাকবে না। তখন এটি হয়ে যাবে ৫৬ পারমাণবিক সংখ্যা বিশিষ্ট বেরিয়াম পরমাণু। আর এই “কোনোভাবে”র জন্য যাকে দায়ী করা হয় তার নামই দূর্বল নিউক্লীয় বল। এই পরিবর্তন বা ভাঙ্গনের সময় একটি ইলেকট্রনের পাশাপাশি একটি ইলেকট্রন এন্টি-নিউট্রিনো নির্গত হবে।

137 Cs 55           =   137 Ba 56  + e+ Ve

প্রোটনটি পরমাণু কেন্দ্রে থেকে যায় এবং ইলেকট্রন ও নিউট্রিনো পরমাণু থেকে নিঃসরিত হয়। নিউট্রিনো পদার্থের সাথে খুব দূর্বলভাবে বিক্রিয়া করে থাকে এবং এটি প্রায় ভরশূণ্য। আর সেজন্য মনে হয় পরমাণু বা পরমাণুকেন্দ্র থেকে নেগেটিভ বিটা কণিকা অর্থাৎ ইলেকট্রনের নিঃসরণ হচ্ছে–আর সেজন্যই এর নাম দেওয়া হয় বিটা ডিকে। এ থেকে প্রাথমিক দিকে অনেক বিজ্ঞানী ভুলভাবে অনুমান করেন যে পরমাণুকেন্দ্র বা নিউক্লিয়াস ইলেকট্রন ও প্রোটন দ্বারা গঠিত কিন্তু আমরা বর্তমানে জানি যে নিউক্লিয়াস গঠিত ধনাত্মক চার্জধারী প্রোটন এবং চার্জবিহীণ নিউট্রাল কণিকা নিউট্রন দ্বারা। তবে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের প্রাথমিক ধারণা থেকে অনেক বিজ্ঞানী তখনই বুঝতে পারেন যে একাধিক ইলেকট্রনকে পরামাণুকেন্দ্রের মতন ক্ষুদ্রস্থানে সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভব নয় ( এটি হয়ে থাকে পাউলির বর্জননীতির কারণে)। মহাকর্ষ বা তড়িত-চুম্বকীয় বলের ন্যায়  দূর্বল বলের কোনো রেঞ্জ বা মেসেঞ্জার পার্টিকেল নেই। কারণ এ বলে দুই বিন্দুর মধ্যে প্রবাহিত হওয়ার কিছু নেই।

মজার ব্যাপার হল এই দূর্বল বলকে বুঝতে বেশ সময় নেয় বিজ্ঞানীদের। ম্যাক্সওয়েল অনেক আগেই বৈদ্যুতিক এবং চুম্ব্বকীয় বলকে একসাথে করলেও তার প্রায় ১০০ বছর পর ১৯৬১ সালে শেলডন গ্ল্যাশো তড়িত-চুম্বকীয় এবং দূর্বল নিউক্লীয় বলকে একীভূত করার জন্য একটি তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। তবে এটি ছিল অসম্পূর্ণ। পরবর্তীতে সালাম এবং ওয়েইনবার্গ নামক দু’জন বিজ্ঞানী এ তত্ত্বের পূর্ণতা প্রদান করেন যা কিনা  “Electroweak Interaction” বা “তাড়িত-চুম্বকীয় মিথস্ক্রিয়া” নামে পরিচিতি লাভ করে. তড়িত-চুম্বকীয় বলের ওখানে আমরা ফোটনের কথা পড়েছিলাম। কিন্তু এই একীভূত তত্ত্বে তারা আরও তিনটি কণিকার অস্তিত্বের কথা বলেন যাদের ভর প্রোটনের ভরের প্রায় ৮০ গুণ(প্রায় ১০০ GeV)। একটি হল ডব্লিউ বোসন। এরা আবার দু’ধরণের W+(ডব্লিউ প্লাস) এবং W-(ডব্লিউ মাইনাস) আর আরেকটি হল জেড বোসন Zo(জেড নট)।

সালাম,ওয়েইনবার্গকৃত তত্বে দূর্বল বলের সৃষ্টি হয় কণিকাসমূহের মধ্যে এই দু’টি ভরযুক্ত কণিকার বিনিময়ের মাধ্যমে এবং বিনিময়কারী কণিকাদু’টি ভর‌যুক্ত হওয়া দূর্বল বলের পাল্লা অল্প হয়ে থাকে। একেবারে গভীরে গিয়ে দেখা যাক দূর্বল বিক্রিয়াতে ঠিক কি ঘটে থাকে। এখানেও বিটা ডিকের সাহায্যেই বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যাক। একটি নিউট্রন গঠিত একটি আপ টাইপ কোয়ার্ক এবং দুইটি ডাউন টাইপ কোয়ার্ক দিয়ে। এখন উইক ইন্টরাকশন হল একমাত্র বিক্রিয়া যাকিনা কোয়ার্কের ফ্লেভার বদলাতে সক্ষম অর্থাৎ এটি একটি আপ কোয়ার্ককে একটি ডাউন কোয়ার্কে অথবা স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্কে রূপান্তরিত করতে পারে। বিপরীত প্রক্রিয়াও সম্ভব। বিটা ডিকেতে নিউক্লিয়াসে অবস্থিত একটি নিউট্রনের মধ্যকার একটি ডাউন কোয়ার্ক;নেগেটিভ চার্জযুক্ত একটি ডব্লিউ বোসোন নিঃসরণের মাধ্যমে একটি আপ কোয়ার্কে পরিণত হয় এবং নিউট্রনটি পরিণত হয় একটি প্রোটনে। এর কারণ প্রোটন গঠিত হয় দু’টি আপ কোয়ার্ক এবং একটি ডাউন কোয়ার্ক দিয়ে। এখন নিঃসরিত ডব্লিউ বোসনটির কি হয়? এটি একটি ইলেকট্রন এবং একটি এন্টি-ইলেকট্রন নিউট্রিনোতে পরিণত হয়। এই ইলেকট্রো-উইক থিউরি থেকে ডব্লিউ এবং জি বোসনের ভর সম্পর্কে ধারণা করা যায় যা পরবর্তী তে পরীক্ষাগারে সঠিক বলে প্রমাণিত হয়।

সালাম-ওয়েইনবার্গ তত্ত্বানুসারে ফোটনসহ নতুন কণিকাগুলো স্বল্পশক্তিতে ভিন্ন আচরণ করলেও ১০০ GeV এর চাইতে অনেক বেশি উচ্চ শক্তিতে এ তারা একই রকম বলে মনেহয়। অনেকটা জোরে পাখা ঘোরার মত। আস্তে ঘুরলে ব্লেডগুলো পৃথকভাবে বোঝা গেলেও জোরে ঘোরার সময় তাদের একই মনেহয়। সালাম-ওয়েইনবার্গ তত্ত্ব দূর্বল বল এবং তড়িত-চুম্বকীয় বলের একীভূতকরণ প্রায় নিঁখুতভাবে ব্যাখ্যা করতে পারায় তাদেরকে ১৯৭৯ সালে পদার্থবিদ্যায় নোবেল দেওয়া হয়। তাদের সাথে নোবেল দেওয়া হয় গ্ল্যাশোকেও। মজার ব্যাপার হল এই একীভূতকরণ তত্ত্ব সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হওয়ার পূর্বেই তারা নোবেল পান। পরবর্তীতে ১৯৮৩ সালে CERN (European Centre for Nuclear Research) তাদের পার্টিকেল এক্সিলারেটরের সাহায্যে ফোটন বাদে বাকি তিনটি ভর যুক্ত কণাকে আবিষ্কার করে এ তত্ত্বকে আরও শক্তিশালী ভিত প্রদান করে। এর জন্য ১৯৮৪ নোবেল পান কার্লো রুবিয়া এবং CERN এর ইঞ্জিনিয়ার সাইমন ভ্যান ডার মীর। শক্তির বিচারে দূর্বল নিউক্লীয় বলের অবস্থান তৃতীয়। এটি মহাকর্ষ বলের প্রায় গুণ।

সবল নিউক্লীয় বলঃ

একটি হিলিয়াম পরমাণুর কথা ধরা যাক। এর নিউক্লিয়াসে দু’টি প্রোটন,দু’টি নিউট্রন রয়েছে। এছাড়া নিউক্লিয়াসের বাইরে কক্ষপথে দুটি ইলেকট্রন ঘূর্ণায়মান রয়েছে। আমরা তড়িত-চুম্বকীয় বলের ওখানে কুলম্বের সূত্র থেকে জেনে এসেছি যে সমধর্মী চার্জ পরষ্পরকে বিকর্ষণ করবে এবং বিপরীতধর্মী পরষ্পরকে আকর্ষণ করবে। কিন্তু একটু খেয়াল করে দেখুনতো হিলিয়াম নিউক্লিয়াসে কিন্তু দিব্যি দু’টি প্রোটন বসে আছে যারা কিনা একই চার্জযুক্ত! তারপরও তারা পরষ্পর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে না,বিকর্ষণ করছে না। অর্থাৎ এখানে কুলম্ব বল থেকেও একটি শক্তিশালী বল খুব অল্প দূরত্বে(Sub-atomic Distance)ক্রিয়া করছে যা কিনা সমধর্মী প্রোটন দু’টিকে একই সাথে থাকতে অনুমতি দিচ্ছে। এখানেই সবল নিউক্লীয় বলের খেলা যা কিনা এ চারটি মৌলিক বলের মাঝে সবচেয়ে শক্তিশালী। এটি মহাকর্ষ বলের পর্যায়  গুণ। নিউক্লীয়ন(প্রোটন ও নিউট্রন) সমূহের মাঝে মেসন নামক স্পিন ১ বিশিষ্ট একটি কণিকার আদান-প্রদানের ফলে এ বলের সৃষ্টি বলে ধারণা করা হয়। এই আদান-প্রদানকে দুটি ব্যক্তির মাঝে পিং পং বলের একবার একদিকে আসা পরে আবার অন্য দিকে যাওয়ার সাথে তুলনা করা যায়। যতক্ষন পর্যন্ত এই মেসন আদান-প্রদান চলবে ততক্ষন পর্যন্ত নিউক্লীয়ন সমূহ একে-অপরকে ধরে রাখতে পারবে। তবে এই মেসন আদন-প্রদান হওয়ার জন্য নিউক্লীয়নগুলোকে খুব কাছাকাছি থাকতে হবে কারণ আমরা আগেই জেনেছি সবল নিউক্লীয় বল খুব অল্প দূরত্বের জন্য ক্রিয়া করে। আর এ দূরত্ব একটি  মিটার যা একটি নিউক্লিয়াসের ব্যাসার্ধের সমান। কেবলমাত্র এই দূরত্বে থাকলেই নিউক্লীয়ন সমূহ সবল নিউক্লীয় বলের প্রভাবে একে অপরের সাথে আটকে থাকবে। কিন্তু যদি দূরত্ব এর চেয়ে বেশি হয় তবে সবল নিউক্লীয় বল আর ক্রিয়া করবে না। তখন তড়িত-চুম্বকীয় বলের জয় হবে এবং এর প্রভাবে নিউক্লীয়নসমূহের মাঝে বিকর্ষণ ঘটবে। নিচের চিত্রটি লক্ষ্য করা যাক,Capture123

এখানে একটি প্রোটনের চারপাশে ডট চিহ্নিত অংশ দ্বারা স্থিরতড়িত বিকর্ষণের ক্ষেত্র বা ব্যারিয়ার নির্দেশ করা হয়েছে। যদি অপর একটি  নিউক্লীয়ন(approaching nucleon) এই ব্যারিয়ার অতিক্রম করে আরও কাছে চলে যেতে পারে তবেই দুটি নিয়ক্লীয়ন সবল বলের প্রভাবে একে অপরের সাথে আটকে থাকবে অর্থাৎ আকর্ষণ করবে। কিন্তু আগন্তুক  নিউক্লীয়নটি যতই অপর নিউক্লীয়নের কাছে যাবে তড়িৎ-চুম্বকীয় বলানুসারে বিকর্ষণ ততই বেড়ে যাবে। তারমানে আগন্তুক নিউক্লিয়নটি যদি অপর নিউক্লীয়নের কাছে যেতে চায় তবে তাকে প্রচন্ড গতিসম্পন্ন হতে হবে  অথবা এমন কোনো প্রভাবক(উচ্চ চাপ বা উচ্চ তাপমাত্রা) লাগবে যা কিনা তাকে বাধ্য করবে অপর নিউক্লীয়নটির কাছে যেতে এবং পরষ্পরের মাঝে মেসন কণা আদান-প্রদানের মাধ্যমে সবল নিউক্লীয় বল উৎপন্ন করতে। কিন্তু কিভাবে এই তড়িত-চুম্বকীয় বিকর্ষণ কমানো যায়?  একটি নিউক্লিয়াসের কথা ভাবুন যেখানে প্রোটনগুলো পরষ্পরকে বিকর্ষণ করছে। কিন্তু নিউট্রনগুলো? তাদেরতো কোনো চার্জ নেই। ফলে তারা বিকর্ষণ  বলের ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা পালন করে না কিন্তু মেসন আদান-প্রদানের মাধ্যমে ঠিকই সবল বল তৈরিতে অংশ নেয়। নিউট্রনগুলো প্রোটন-প্রোটন বিকর্ষণ বল হ্রাসে সহায়তা করে থাকে। তারা প্রোটনগুলোর মাঝে অনেকটা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে। ফলে প্রোটনগুলো নিজেদের মাঝে ঝগড়াঝাঁটি(বিকর্ষণ)বাদ দিয়ে বরং  মেসন আদান-প্রদানের মাধ্যমে সবল বল তৈরিতে অধিক মনযোগী হয়। আর এ কারণেই কোনো পরমাণুর নিউক্লিয়াসে প্রোটন অপেক্ষা নিউটন দ্বারা সবল বল তৈরি অধিকতর সহজ। সবল নিউক্লীয় বল মহাকর্ষ বলে প্রায়  গুণ।

 

যে একটি প্রশ্ন আমাদের সকলের মাথায় ঘুরপাক খেতে পারে তা হল প্রকৃতির এই চারটি মৌলিক বলের মাঝে মহাকর্ষ বল সবচেয়ে কম শক্তিশালী হওয়ার পরও কেনো এর প্রভাবই সর্বত্র বিদ্যমান? এই প্রশ্নের উত্তর আমি আগেই দিয়ে দিয়েছি। মহাকর্ষ বল হল কেবলমাত্র আকর্ষণধর্মী বল। তাই এই বলের নাকচ বা রূপান্তরিত হয়ে যাওয়ার কোনোরকম  সম্ভাবনা নেই যা অন্যান্য বলগুলোর ক্ষেত্রে ঘটে থাকে। যেমন বিশাল আকৃতির একটি বস্তুতে প্রায় সমান সংখ্যক বিপরীত আধান থাকার ফলে এর নীট আধান শূণ্য হয়। কিন্তু ভরের ক্ষেত্রে এটি ঘটা সম্ভব না। মহাকর্ষ বল যেমন করে স্থূল জগতে উপলব্ধি করা সম্ভব অন্যান্য বলগুলো ক্ষেত্রে তা সম্ভব নয়। এদের উপস্থিতি আমার পাই উচ্চ শক্তির পার্টিকেল এক্সিলারেটর যন্ত্রে।

বলের প্রথম একীভূতকরণ কিন্তু করে থাকেন বিজ্ঞানী নিউটন ১৬৮৬ সালে তিনি যখন তার মহাকর্ষ সূত্র প্রকাশ করেন! তিনি মহাবিশ্বে অবস্থিত বা খ-গোলকীয় বস্তুগুলোর মধ্যকার সমূহকে পৃথিবীতে অনুভূত বলের সাথে একীভূত করেন। পরে ঊনবিংশ শতাব্দীতে এসে ম্যাক্সওয়েলের তড়িত-চুম্বকীয় তত্ত্বের পূর্ণতা লাভের মাধ্যমে একীভূত হয় তড়িত ও  চুম্বকীয় বল। এর পরের একীভূতকরণ অর্থাৎ তড়িৎ এবং দূর্বল নিউক্লীয় বলের একীভূতকরণ সম্ভব হয় গ্ল্যাশো-সালাম-ওয়েইনবার্গ তত্ত্ব দ্বারা। এখন আশাবাদী জীব হিসাবে আমাদের মনে প্রশ্ন আসতেই পারে তাহলে কি কেমন কোনো বল রয়েছে যা কিনা একীভূত করতে পারবে তড়িত বল এবং সবল নিউক্লীয় বলকে? নিন্মে সম্ভাব্য চূড়ান্ত একীভূতকরণের একটি চিত্র দেওয়া হলঃcotur

বিজ্ঞানীরা কিন্তু থেমে নেই। তারা নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন এই একীভূতকরণের কাজে যার নামটাও বেশ গালভরা। এর নাম “Grand Unified Theory”। তবে এটি প্রমাণে আমাদের রয়েছে অনেক সীমাবদ্ধতা। পার্টিকেল এক্সিলারেটরে সংঘর্ষ ঘটাতে হবে প্রায় ১০০০ মিলিয়ন মিলিয়ন GeV শক্তিসম্পন্ন কণার মধ্যে! এও কি সম্ভব? আর “Grand Unified Theory” ই বা কি? কোন কোন রহস্যের উদঘাটন করবে সে? এসকল প্রশ্নের উত্তর নাহয় জানাবো আরেকটি লেখায়।

 


                          Wikipedia

“A Brief History of Time” by Stephen Hawking

“মুক্তমনা”তে প্রকাশিত ডঃ তানভীর হানিফের লেখা “দূর্বল বলের কথা”

 

 

“হোমো ইরেক্টাসদের কথা”

এই লেখাটি পড়ার আগে সবাইকে একটা ব্যাপার বলে রাখা ভালো যে, আমি মোটেই এসকল বিষয়ে ভালো জ্ঞান রাখি না।একদিন আমার এক স্টুডেন্ট আমার কাছে হোমো ইরেক্টাস সম্পর্কে জানতে চায়।টার্মটা পরিচিত থাকলেও এ ব্যাপারে আমার জ্ঞান প্রায় শূণ্যের কাছাকাছি হওয়ায় আমি ব্যাপারটি এড়িয়ে যাই।কিন্তু সে নাছোড়বান্দা হয়ে প্রতিদিনই একই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে।তার এই জ্ঞান পিপাসা মিটানোর জন্য এবার  মাঠে নামতে হয় আমাকে।তাই গুগল,উইকি,এঙ্কার্টা আর দু’একটা বই ঘাটাঘাটি করে যা  পেলাম তাই গুছিয়ে লিখতে বসে গেলাম।গুছিয়ে লিখতে পারব কিনা জানি না তবে চেষ্টা করার দুঃসাহসের সুযোগটা হাতছাড়া করতে রাজি না।আর ভুল হলে তো আপনারা আছেনই। হোমো ইরেক্টাসের উৎপত্তিস্থল এতদিন ধরে আফ্রিকাকে বলা হলেও সাম্প্রতিককালে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ভিন্নমত দেখা যায়।অধুনা বিজ্ঞানীদের মাঝে কেউ কেউ মনে করেন যে, হোমো ইরেক্টাসের কোনো পূর্বপুরুষ সুদূর অতীতে আফ্রিকা ত্যাগ করে।সেখান থেকে তারা জাভা এবং আফ্রিকায় গমন করে।যদিও জর্জিয়া থেকে শুরু করে চীন এমনকি ইসরায়েলেও হোমো ইরেক্টাসদের নিদর্শন পাওয়া যায়।অনেক বিজ্ঞানীই আফ্রিকান আর এশিয়ান হোমো ইরেক্টাসের মাঝে অনেক অমিল আছে বলে দাবি করেন।সে কারণে তারা আফ্রিকান ইরেক্টাসদের একটি বিশেষ নাম প্রস্তাব করেন।সেটি হল ‘হোমো আরগাস্টার’। কথাটার অর্থ হল কর্মক্ষম মানুষ। আফ্রিকা,এশিয়া,ইউরোপ জুড়ে একসময় বাস কতো এই হোমো ইরেক্টাসরা।এদেরকে খাড়া মানুষও বলা হত।প্রায় ২.৫ মিলিয়ন বছর আগেরকার অস্ট্রালো পিথেকাসদেরকে এদের আদিপুরুষ হিসাবে ধরে নেওয়া হয়। এদের মগজ ছিল বেশি এবং দেহও ছিল সুগঠিত।বেশ কয়েক ধরণের ইরেক্টাস আছে।এদের মাঝে অন্যতম হচ্ছে পিথিকানথ্রপাস ইরেক্টাস। পিথিকানথ্রপাস ইরেক্টাস ইন্দোনেশিয়া থেকে আবিষ্কৃত হয়েছিল।এই প্রজাতি আবিষ্কারের কৃতিত্ব ইউজিন দুবোয়ার।দুবোয়া ১৮৫৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৪০ সালে মারা যান।আমস্টারডাম ইউনিভার্সিটির এনাটমির প্রভাষক থাকার সময় তার মাথায় পুরা মানবের ফসিল নিয়ে কাজ এবং ফসিল আবিষ্কারের ঝোঁক চাপে।জার্মান প্রকৃতিবিদ আর্নস্ট হেকেল এবং ইংরেজ পন্ডিত ডারউইনের লেখা পড়ে প্রভাবিত হন দুবোয়া।মাত্র ৩০ বছর বয়সে অন্ধ হয়ে যাওয়া বিজ্ঞানী হেকেল মানুষের বিবর্তন,জীবদেহের গঠন তত্ত্ব, ও সৃষ্টির ইতিহাস নিয়ে ১৮৭০ থেকে ১৮৮০ সালের মাঝে তিনটি বই লিখে সাড়া ফেলে দেন। তিনি জীবজগতের সূচনাকারী হিসাবে ফেনেরন নামক একটি আনুবীক্ষণিক জীবের কথা বলেন।নাম যাই হোক না কেন আধুনিক বিজ্ঞানও কিন্তু স্বীকার করে যে,বিবর্তনের সূচনা হয়েছে আনুবীক্ষণিক জীব থেকেই।হেকেল নরবানর আর মানুষের মধ্যবর্তী যে প্রানীটিকে মানুষের পূর্বপুরুষ বলে কল্পনা করে নিয়েছিলেন তার নামই ছিল পিথিকানথ্রপাস।আর দুবোয়া এই পিথিকানথ্রপাস আবিষ্কারের নেশাতেই পাড়ি জমিয়েছিলেন সমুদ্রের ওপাড়ে। ওরাং ওটাং অধ্যুষিত পূর্ব ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন দুবোয়া।সামরিক বাহিনীর একজন ডাক্তার হিসেবে ওলন্দাজ শাসিত ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রায় ১৮৮৭ সালের ডিসেম্বর মাসে তিনি পৌছান।১৮৮৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে একটি গুহায় অনুসন্ধান চালিয়ে ব্যর্থ হওয়ার পর একই বছরের জাভার ওয়াদিয়াক এলাকা থেকে একটি প্রাচীন খুলি আবিষ্কার করেন তিনি। ইন্দোনেশিয়ার জাভা দ্বীপের পূর্ব ভাগে ত্রিনীল নামের একটি গ্রাম ছিল তখন।প্রশান্ত মহাসাগরের নিকটবর্তী হওয়ায় এই এলাকায় ছিল আগ্নেয়গিরির ছড়াছড়ি।কিছু কিছু আগ্নেয়গিরি জীবিত হলেও বাকিরা ছিল মৃত।এলাকার ধার ধরে ছিল সোলো নামের একটি নদী।এই নদীর তীরবর্তী গ্রাম থেকেই দুবোয়া আবিষ্কার করেছিলেন পিথিকানথ্রপাসের ফসিল।

                                                 
                                                 পিথিকানথ্রপাসের ফসিল

১৮৯১ ও ১৮৯২ সালের কোয়াটারনারি যুগের ফসিলগুলো পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছে যে, এগুলোর বয়স প্রায় পাঁচ লক্ষ বছর।১৮৯১ এর আবিষ্কারের মধ্যে ছিল উপরের পাটির ডান দিকের তৃতীয় পেষকের দাঁত এবং করোটিকার চূড়া।দুবোয়ার ১৮৯২ সালের আবিষ্কারের মাঝে ছিল উরুর হাড় বা ফিমার।পিথিকানথ্রপাসের করোটি আবিষ্কৃত হয়েছিল ১৫ মিটার গভীর থেকে।পরবর্তীতে এই প্রাণীটিই জাভামানব নামে খ্যাত হয়েছিল।দুবোয়া তার এই গবেষণা ১৯২৩ সালে প্রচার করার পর গোটা দুনিয়ায় হই চই পড়ে যায়।১৯৩৬ থেকে ১৯৪২ সালের মাঝে ফনক্যানিংস জাভা মানবের তিনটি খুলি আবিষ্কার করেন।

                                     
                                               জাভা মানবের মাথার খুলি

তবে হোমো ইরেক্টাসের পুরো কঙ্কাল পাওয়া যায় ১৯৮৪ সালে রিচার্ড লিকির নেতৃত্বে উত্তর কেনিয়ার তুরকানা নামক লেকের কাছে।কংকালটি ছিল ১২ বছরে একটি ছেলের যে  কিনা ১.৫৪ মিলিয়ন বছর আগে মারা যায়।যে “তুরকানা বয়” নামে খ্যাত।

                                       
                              তুরকানা বয়

প্রকৃতপক্ষে জাভা এবং পিকিং মানবদের বৈজ্ঞানিক নামই হল হোমো ইরেক্টাস আর  আধুনিক মানুষের বৈজ্ঞানিক নাম হোমো সেপিএন্স।আমি লেখার সরলতা আর আকার ছোটো করার উদ্দ্যেশে জাভা এবং পিকিং মানব নিয়ে আলোচনা পরিহার করেছি।সময় পেলে এদেরকে নিয়ে আলাদা করে লেখার ইচ্ছা আছে আধুনিক,জাভা এবং পিকিং মানব সবাই হোমো গণভূক্ত।হোমোদের মাঝে এখনও টিকে আছে আধুনিক মানুষ।নিচের এই ছবিটি থেকে পিথিকানথ্রপাস এবং আধুনিক মানুষের দেহের পার্থক্য সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

                                
                      আধুনিক মানুষ বনাম হোমো ইরেক্টাস

লেখা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছে করছে না। তবে আমি আগেই বলেছি মানব বিবর্তন এমনই এক মহাকাব্য যে তা শেষ হওয়ার নয়। আর এ মহাকাব্যের রচয়িতা যে, যে এই মহাকাব্যের প্রতিটি লাইন অলংকৃত করেছে অসাধারণ ছন্দে তা কিন্তু আমি ,আপনি অর্থাৎ এই মানুষ বৈ আর কেউ নয়। হয়তো বিবর্তনের এই খেলায় আমাদের এই  আধুনিক মানব সমাজকেও আদি হয়ে যেতে হবে আরও আধুনিকতর আরেকটি সমাজকে স্থান দিতে গিয়ে। তবে দুঃখ কি? আমাদেরকে হারিয়ে যেতে দেবে না সেই আধুনিক সমাজ। ঠিকই বের করে নেবে আমাদের সকল ইতিহাস। টিকিয়ে রাখবে আমাদেরকে ইতিহাসের পাতায় মানব সভ্যতার ধারক হিসেবে। আর এভাবেই চলবে আমাদের মানব সভ্যতার জয়রথ। সবাইকে এই জয়রথে সঙ্গী হওয়ার আহবান জানিয়ে শেষ করছি।

“সৃষ্টির যত কথা”

বিশাল এই মহাবিশ্বের ছোট এই পৃথিবীর বাসিন্দা আমরা। এখন পর্যন্ত মহাবিশ্বের সবচেয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রাণী আমারই। প্রায় ৪৫০ কোটি বছর আগে সৃষ্টি আমাদের এই নিবাসের। আর মা্নুষ সর্বদা তার এই শেকড়ের সন্ধান করেছে চলেছে। কিভাবে সৃষ্টি হল এই পৃথিবী নামের গ্রহটির? যুগে যুগে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বেরিয়ে নানান সময়ে তৈরি হয়েছে নানান মতবাদ। পুরাতন একটি মতবাদের উপর ভিত্তি করে  কিংবা বাতিল করে তৈরি করা হয়েছে নতুন মতবাদ। তারপরেও সন্তুষ্ট হয়নি মানুষ। আবার এসেছে নতুন মতবাদ। এখনও এসব নিয়ে চলছে বিতর্ক। আমি আমার এই লেখায় দুই পর্বের মাধ্যমে আমাদের এই পৃথিবী সৃষ্টির ব্যাপারে কিছু জনপ্রিয় এবং গ্রহণযোগ্য মতবাদ নিয়ে বলার চেষ্টা করব।

জেমস জিন্সের মতবাদ বা জোয়ার  মতবাদঃ

নানান সময়ে পৃথিবী সৃষ্টির পিছনে নানান মতবাদ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও একটি ব্যাপারে কিন্তু বিজ্ঞানীরা একমত যে,পৃথিবী সৃষ্টির পিছনে রয়েছে সূর্যের একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। আর তাই আধুনিক বলি বা আদিই বলি সকল মতবাদই কিন্তু ঐ সূর্যের উপর ভিত্তি করেই। যেমন এই জেমস জিন্সের মতবাদটি। বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী জেমস জিন্স ১৯১৭ সালে এই মতবাদটি উপস্থাপন করেন। এটি অনেকটা এইরকম……………

আমাদের বিশাল এই মহাবিশ্বে রয়েছে গ্রহ,নক্ষত্র,ছায়াপথের মত আরও নানান মহাজাগতিক বস্তু। এখানে নক্ষত্রসহ অন্যান্য বস্তুর অবস্থান পরিবর্তনের ঘটনা মোটেও অস্বাভাবিক নয়। এই মতবাদ অনুসারে ধারণা করা হয় যে এক সময় চলতে চলতে বিশাল এক নক্ষত্র সূর্যের সামনে এসে পড়েছিল। আর নক্ষত্রটির আকার সূর্যের চেয়ে বড় হওয়ায় তার আকর্ষণী ক্ষমতাও ছিল সূর্যের চেয়ে বেশি। আবার সূর্যের ভিতরেও কিন্তু চলছে এক ধরণের আকর্ষণী ক্ষমতা যা কিনা সূর্যের ভিতরকার বস্তুগুলোকে ধরে রাখার জন্য যথেষ্ট। আমরা জানি সূর্যের ভিতরে প্রতিনিয়তই চলছে বিস্ফোরণ যার ফলে সূর্যপৃষ্ঠে সৃষ্টি হয় জোয়ারের মত একটা পরিবেশ। সেই বিশাল নক্ষত্রের ফলে এই জোয়ারের মাত্রা যায় আরও বেড়ে। যদিও সূর্যের নিজস্ব আকর্ষণী ক্ষমতার কারণে ভিতরকার বস্তু সৌরপৃষ্ঠ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে না। কিন্তু সেই দানবাকৃতির সেই নক্ষত্রের কারণে সৌরপৃষ্ঠ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় বেশ খানিকটা অংশ। কি ভয়ানক কথা!! তবে এতো ভয় পাওয়ার কিছু নেই। সূর্য থেকে কিছুটা অংশ বিচ্ছিন্ন করলেও নক্ষত্রটি কিন্তু তা সাথে করে নিয়ে যেতে পারেনি। এর কারণটা একটু ব্যাখ্যা করা যাক।যেহেতু নক্ষত্রটি ক্রমান্বয়ে সূর্যের নিকটতর হয়েছিল তাই তার আকর্ষণী ক্ষমতাও বেড়ে গিয়েছিল এবং উভয়ের আনুপাতিক গতিবেগও বেড়েছিল। সৌরপৃষ্ঠ থেকে বিচ্ছিন্ন হবার সময় কিন্তু বিচ্ছিন্ন অংশটির উপর দ্বিমুখী বল কাজ করছিল। একটি ছিল সেই আগন্তুক নক্ষত্রটির টান এবং অপরটি সূর্যের নিজস্ব টান।এইসব ক্রিয়ার ফলে সেই বিচ্ছিন্ন অংশটির অবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না। তার আকার হয়ে গিয়েছিল অনেকটা মাকুর মত অর্থাৎ মাথা ও লেজের অংশ চিকন এবং মধ্যে মোটা। তো, সেই বিচ্ছিন্ন অংশটি সূর্যের টান ছেড়ে নক্ষত্রের দিকে আগালেও নক্ষত্রটি কিন্তু রাগ করে আপন গতিতে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। ফলে নক্ষত্রের গতির সাথে তাল মেলানো সম্ভব হয়নি সেই বিচ্ছিন্ন অংশটির। কিন্তু বিচ্ছিন্ন আর আকারে ছোটো হলে কি হবে সেই বা কম যায় কিসে? তাই নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার জন্য সে ইতোমধ্যেই অর্জন করে নিজস্ব একটা গতিবেগ। এদিকে নক্ষত্রটি বেশ দূরে সরে গেলেও তার আদিনিবাস সূর্য কিন্তু বেশি দূরে যেতে না পারার কারণে তার আকর্ষনও অগ্রাহ্য করতে পারেনি। কিন্তু এর মাঝে যে সূর্য ব্যাটারও মাথা খারাপ। সে আর আগের মত কাছে টেনে নেয় না সেই অংশটিকে। আবার দূরেও ঠেলে দিতে পারে না। তাই সূর্য তার চারপাশে ঘোরার অনুমতি দেয় সেই বিচ্ছিন্ন অংশটিকে। সূর্যের প্রচন্ড তাপে সেই বিচ্ছিন্ন অংশটির পুরোটাই ছিল প্রথমে গ্যাসীয় আর আকার ছিল সেই মাকুর মত। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে প্রান্তের চিকন অংশ ঠান্ডা হয়ে আসে এবং তরলে পরিণত হতে থাকে। যেহেতু তরল আর গ্যাসীয় অবস্থা দুটি একসাথে থাকতে পারেনি তাই দুই প্রান্তের তরল অংশদুটি আলাদা হয়ে যায়। অবশ্য তরল হলেও এদের তাপমাত্রা ছিল প্রচন্ড। একই প্রক্রিয়ায় বিচ্ছিন্ন বাকি অংশগুলোও তাপ বিকিরণের মাধ্যমে খন্ডে খন্ডে ভাগ হতে থাকে। আর এই খন্ডগুলোর একটিই হল এক একটি গ্রহ। যাদের একজন আমাদের এই পৃথিবী। আবার গ্রহগুলোর ভিতরেও সূর্যের আকর্ষণে সৃষ্ট জোয়ারের কারণে বেশ কিছু অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে উপগ্রহের সৃষ্টি হয়। ঠিক এমনি ভাবেই সৃষ্টি হয় পৃথিবীর উপগ্রহ চাঁদ।

ইমানুয়েল কান্টের এর মতবাদঃ

বৈজ্ঞানিক যুক্তি নির্ভর মতবাদের মধ্যে ইমানুয়েল কান্টের এর এই মতবাদটিকে প্রাচীনতম বলে গণ্য করা হয়। এটি নীহারিকা প্রকল্প নামে পরিচিত।সুইডিশ বিজ্ঞানী সুইডেনবার্গের সহায়তায় ১৭৫৫ সালে জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট গ্রহ-উপগ্রহের সৃষ্টি সম্পর্কে একটি মতবাদ প্রদান করেন। এই মতবাদ অনুযায়ী সূর্যসহ সৌরজগতের সকল গ্রহ-উপগ্রহ সমূহ এককালে একটি প্রসারিত নীহারিকা ছিল। ঘূর্ণায়মান এই নীহারিকার ভিতরে বিভিন্ন বস্তুর অবস্থান ছিল। এই বস্তুসমূহের মধ্যে আলাদা আলাদা আকর্ষণী শক্তিও ছিল। পারস্পরিক এই আকর্ষণের ফলে এসকল বস্তুসমূহের মাঝে সৃষ্টি হয় সংঘাতের। ফলে সৃষ্টি হয় প্রচন্ড উত্তাপের। একসময় “নিশ্চল” বস্তুকণার সমন্বয়ে গঠিত এই নীহারিকার মাঝে উত্তাপ,ঘূর্ণনবেগ ও গতির সঞ্চার হয়। এরই ফলে নীহারিকা থেকে আংটির আকারের কিছু বস্তু নীহারিকা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।এভাবে গ্রহের জন্ম হয় এবং তা থেকে উপগ্রহের পরবর্তীতে জন্ম হয়।

বলয় মতবাদঃ

                 নীহারিকা প্রকল্পে কিছু পরিবর্তন এনে  ১৭৯৬ সামে সাইমন দ্যা লাপ্লাস একটি মতবাদ দেন। এই মতবাদ ইমানুয়েল কান্টের মতবাদে বর্ণিত নীহারিকাটিকে কান্টের মত নিশ্চল ও ঠান্ডা মানতে নারাজ। লাপ্লাস দাবি করেন যে,নীহারিকাটি সূচনাকালেও ঘূর্ণায়মান গতি সম্পন্ন এবং উত্তপ্ত ছিল।কালক্রমে তা বিকিরণ প্রক্রিয়ায় তাপ হারায় ও সংকুচিত হয়।এসময় তার কৌনিক ভরবেগের সমতা রক্ষার প্রয়োজনে এর ঘূর্ণনবেগ বাড়ে।ফলে সংকোচন দশায় এর উত্তাপ বাড়ে।এইসকল প্রতিক্রিয়ার ফলে নীহারিকাটি এক সময় দৈর্ঘ্যের চেয়ে প্রস্থে বেশি প্রসারিত হয়ে চাকার মত আকার ধারণ করে।যতই দিন বাড়তে থাকে ততোই চওড়া অংশটির আকার বাড়তে থাকে।ফলে এক সময় বলয়ের আকার বিশিষ্ট একটি অংশ নীহারিকাটি থেকে আলাদা হয়ে যায়।আলাদা হয়ে যাওয়া অংশ থেকে সৃষ্টি হয় গ্রহ-উপগ্রহের আর যে অংশটি মূল নীহারিকার সাথে থেকে গিয়েছিল তা পরিণত হয়য় সূর্যে।

অদ্বৈত মতবাদঃ

তুলনামূলক পরবর্তীতে এই মতবাদটি দেওয়া হয়েছে। আলফভেন নামক একজন বিজ্ঞানী এ মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি দাবি করেন যে,  সমস্ত সৌরজগতের সৃষ্টি একটি মাত্র নক্ষত্র থেকে হয়েছে এবং একাধিক নক্ষত্রের মাঝে আকর্ষণ-বিকর্ষণ বা সংঘর্ষের কোনো প্রভাব এতে নেই। বরং এক বিশেষ ধরণের চুম্বকীয় শক্তির প্রভাবেই সৃষ্টি হয়েছে সৌরজগতের।

এছাড়া অন্যান্য মতবাদের মাঝে চেম্বারলেন ও মুলটনের মতবাদ,লিটলটনের মতবাদ,উইজ স্যাকারের মতবাদ এবং রাসেলের মতবাদ উল্লেখযোগ্য।

%d bloggers like this: